attohotta

টিপু সুলতান

ঝুপঝাপ বৃষ্টি ভেজা সকাল। শ্রাবণ এসেছে বলে
থেমেথেমে মেঘ বৃষ্টিবাদল বিলিয়ে জানান দিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে টুপটাপ থৈথৈ জলফোঁটার শব্দে। এসেছি শ্রাবণ। ঘর ছেড়ে রুজিরোজগারের উদ্দেশ্যে বাহির হয়েছেন প্রায়শ মানুষ।
তেমনি ভ্যানগাড়ি নিয়ে বাহির হয়েছে বস্তি তল্লাটের হতদরিদ্রতর ইদ্রিস।
সারাদিনের কর্মক্লান্ত বেলা শেষে বাসার দিকে যেতে যেতে এমন সময়ে ছুটে এলো ট্রাফিকপুলিশ।
বলল, এই শালা’ রঙ সাইডে আসলি এটা কি তোর বাপ দাদার আইন।
একেতো পুলিশ ভুল করলে ইতিহাস বানিয়ে ফেলিস।
ভালো কিছু করলে নাম নিস না।
তোরা জব্বর গ্যাঁড়াকলরে গ্যাঁড়াকল।

ইদ্রিস শুনতে শুনতে হাতজোড় করে নত হয়ে বলল, স্যার, আমারে আজকার মতো মাপ কইরা দ্যান স্যার। আমার ভুল হয়ে গেছে স্যার।
এই রোডে আর চালামু না স্যার।
ট্রাফিকপুলিশ কোনো কর্ণপাত না করেই সোজাসাপ্টা ভ্যানগাড়িতে রেকার চেপে দিয়েই বলল, যাহ শালা।
স্যার, আমারে মাইরেন না স্যার, আমি আর এই রোডে চালামু না স্যার।
ইদ্রিস-লো ভরাট কণ্ঠে জড়্গ্রস্থ হাত তুলে ট্রাফিকপুলিশ,
সার্জেন্ট অফিসারের নিকট দৌড়াদৌড়ি করতে লাগল।
সার্জেন্ট অফিসারের মুঠো থেকে ওয়ারলেসের ভেতরে মুহূর্তেক কড়কড় শশ’শব্দে আওয়াজ ভেসে আসলো, এই সামনে ক্লিয়ার রাখুন। ভি আই পি…
ট্রাফিকপুলিশ, সার্জেন্ট অফিসারের নিয়ম নীতি দায়িত্বভার বেড়ে গেল।
মিনিটে মিনেটে বাঁশি ফুঁকো হচ্ছে। ইদ্রিস বেবোধ বুজে টলমল চোখে মাটির মুখোমুখি মাথা নুয়ে ভ্যান গাড়ির হাতল ধরে দাঁড়িয়ে গেল।
চোখের ভেতর পৃথিবী ঘুরছে। গাছপালা আঁকাবাঁকা দেখাচ্ছে।
জীর্ণশীর্ণ ক্ষীণগায়ের মুদ্রামুদ্রা ঘাম মুছতে মুছতে আবার সার্জেন্ট অফিসারের দিকে গেল।
সার্জেন্ট অফিসার চুপচাপ দাঁড়িয়ে বলল, কিরে তোরা আর কবে ভালো হবি। তোদের হিসাবকিতাবে আমাদের মাথা খেয়ে ফেলিস।পরে আসিস।

স্যার, স্যার, আমার গাড়িটা দ্যান না-স্যার। এই দেখুন স্যার, প্রতিদিন ফোস্কাপড়া হাতে রুজিরোজগার করি। এখান থেকে যাইয়ে আমার ছোট্ট খোকাডার নতুন জামা কিনে দিতে হবে,স্যার। এইবার ক্লাস ওয়ানে উঠেছে। স্কুলের ম্যাডাম কইছে স্কুল ড্রেস পরে যাইতে। আমি ঘরে ফিরলে আমার সাথে নতুন জামা কিনতে মার্কেটে যাইবে। অনেকদিন কয় কিন্তু চালডাল কিনতে কিনতে আর ওগুলো কিনে দেওয়া হয় না। একটা ডিম ভেঙে চারভাগ করে দিতে হয়। একটা করে দিতে পারি না। আর মেয়েডার বাংলার খাতা কিনে দিতে হবে স্যার। মেয়েডার স্কুল স্যার কইছে হাতের লেখা লিখতে। মেয়েডা আমার কইলো, বাবা-স্যারে বলছে, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। মুখস্থ লিখে নিয়ে যেতে।খাতা নেই।আমার খাতা কিনে দাও। মেয়েডার একজোড়া ভালো জুতোও নেই স্যার। প্রতিদিন খালিপায়ে স্কুল করে।

ইদ্রিস কথাগুলো বলতে বলতে অশ্রুসজলে ছেঁড়াখোঁড়া শার্ট, বোতাম পস্তর ভেজাভেজা হয়ে উঠলো। সার্জেন্ট অফিসার গোরক্ষক ক্রাকচক্রে ঘুরেই জোরসে হহ্মভ্র হুম চিল্লান দিয়ে উঠলো। এই শালা! হারামজাদা! তোরে বলেছি না ছয় ঘন্টা পরে নিবি। নইলে তোর গাড়ি এক্কেবারে গুঁড়ো করে ফেলবো।

ইদ্রিস, সংকুচিত আত্মক্লোজে ভয়ে সরে দাঁড়ালো।
খানিকবাদে দেশ উন্নয়নের বছরপূর্তির একটি মিছিল আসলো।
পড়ন্ত বিকেলে জড়ো হলো মোড় থেকে রাস্তার এপার ওপার।
শুরু হলো মিছিলের ভেতর থেকে আগুন সুপ্তোত্থিত বিস্ফারণ, রগচটা উল্লাস। ধাক্কাধাক্কি, তর্ক, গ্রেফতার, মারামারি। পালানো-
পুলিশে পেটানো বিজ্জকুটি মিছিলের পরিবেশ ছত্রভঙ্গ করে ফেলল।
ইদ্রিস তবু লক্ষ্মীদেব ভ্যানগাড়িটার হাতল ছাড়ে না।
পাশ থেকে আরেক পুলিশ ধপাংধপাং কসে ইদ্রিসকে লাঠিপেটা করতে লাগল।
ইদ্রিসের ভেতর থেকে ইস শব্দটা যেন মুহূর্তেক বিষিয়ে গেল কান্নায়।
স্যার, স্যার আমার কোন দোষ নেই। আমার কোন দোষ নেই স্যার।
তবু হ্যান্ডক্যাপ পরিয়ে নিয়ে গেলো। সন্ধ্যাকাল পর্যন্ত হাজতে বেঘোর ভাবনায় জটলা পাকিয়ে হঠাৎ হাজতি এক পুলিশকে ডেকে বলল।
স্যার, আমাকে একটু সাহায্য করুন না স্যার। একটা কলম আর একটু কাগজ যদি…
পুলিশ কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কি যে যেন ভাবলেন। এবং পরক্ষনে সাহায্য করলেন। ইদ্রিস লিখে ফেলল জীবনের নিধার্য অক্ষর ভাঙ্গা ছিটানো শব্দের লাইনে-

পিয় বউ, শিশির।
পতমে খমা কর। আমি আর হয়ত তোমাগে দেকতে পাব না।
দেকাও হবে না। আমি জেলে আছি।
কেন যানি পিতিবিডা আমার চিনল না।
কেন যানি ভেতরের কস্টগুলো বার হবার আগে মানুস জিততে পারে না।
কেন যানি…
বউ, ময়না আমার। খোখারে, মাইডারে জানায়ো না। বলবা, তোমার বাব ভ্যানগাড়ি নি বিদাশ গেচে।
পিয় বউ-একন শহরে, গেরামে মানস থাকে না। নাক্ষস।
আর অনুরোদ করি, তোমরা এ শহর চেড়ে গেরামে যাও।
কিচুটা বালো থাকবা।

ইতি
ইদ্রিস।

হাজতে বসেই লেখাটি শেষ করে ইদ্রিস।
পরক্ষনে পুলিশ অফিসারকে ডেকে বলল এই ন্যান স্যার।
পুলিশটি তাকিয়ে দেখল,চোখেমুখে তার আতংকিত ঝাপ্সা রূপ।
পুলিশ অফিসার জিগ্যেস করলো, তোমার কি সমস্যা?
ইদ্রিস ভারাক্রান্তে হুমড়ি দিয়ে বলতে বলতে চিঠিটা বুকপকেটে গুঁজে রাখলো। আর বলল স্যার…আমার সব ইচ্ছা শেষ।
দয়াকরে একটু দারোগা স্যারের সাথে দেখা করতে দ্যান না স্যার।
পুলিশ তাৎক্ষণিক, না না শব্দে নড়ে উঠলো। তোর বাপু মাথা খারাপ! আমার চাকরী খাবি নাকি তুই।
স্যার, আমারে একটু সুযোগ দ্যান। স্যারের সঙ্গে একমিনিট কথা কইবো।
পুলিশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে রাজি হয়ে গেলো এবং ইদ্রিসকে বলল কেউ যেন না জানে।
দারোগা স্যার খুব ভালো মানুষ। সব কথা খুলে বলিস। একটা ব্যবস্থা হয়তো করে দিবোনি।
হাজত থেকে বেরিয়ে ইদ্রিস সোজা দারোগার রুমে গেলো।
সেলাম স্যার।
দারোগা সাহেব উত্তর নিয়ে বলল কিরে ব্যাটা তোর আবার কি সমস্যা? বাবা খেয়েছিস, বাবা। বাপু- তোদের জন্যেও আমরাও ভালো থাকতে পারি না।
ইদ্রিস হাউমাউ করে কান্নাকাটি করতে করতে লাল গামছা মুখে চেপেই দারোগার টেবিলে পিস্তলটা টান মেরেই নিজের বুকে সপাংসাপাং ফায়ার।
বিকট শব্দ।
ছেন্নাৎ করে রক্ত ছুটে বের হয়ে গেলো পুরো রুমে।
ইদ্রিস কান্নারচোটে বলল- স্যার, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার কোন দোষ নেই স্যার। আমার কোন দোষ নেই।

বুক পকেটে চিঠিটা হাতে নিয়েই পড়ে গেলো রুমের মেঝেতে।
ছুটে এলো হাজতের সমস্ত পুলিশ। পরের দিন পেপারে ছাপা হলো পুলিশি হাজতে এক এবনরমাল মেন্টালির আত্মহত্যা।

সম্পাদক ও প্রকাশক : মতি গাজ্জালী
kabitasram@gmail.com, info@kabitasram.com
নাহার প্লাজা, ৩৭ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা